সময়কে খেয়ে চলে এক নীরব জোনাকি
মেয়েটা প্রতিদিন হেঁটেই আসে।
মধুবাগ থেকে সোজা হাতিরঝিলের মাথা তারপর সিগন্যাল পড়লে রাস্তা পার হলেই সোনার গাঁ রোড। হাতিরঝিল না হলে এই দ্রুত স্থানান্তর কখনই সম্ভব হত না। সাকুল্যে ১৫ মিনিটের পথ। কতকিছু বদলে গেল গত কয়েক বছরে!
শাপলার ভ্যানিটি ব্যাগে একসময় শিল্পী সমিতির আইডি কার্ড থাকতো। সে সময় প্রতিদিন এফডিসির গেট পার হয়ে ভেতর পর্যন্ত আসতে রীতিমত যুদ্ধ করতে হত। এত মানুষ ঘন্টার ঘন্টা কিসের জন্য অমন করে গেটটা ঘিরে থাকতো কে জানে!
এখন আইডি কার্ড লাগে না। অবশ্য সেই ভিড়ও নেই, সেই কার্ডও নেই। গেটম্যান শাপলা কে চেনে। বুড়ো লোক, বটগাছের মত পড়ে আছে বছর পঁচিশ। শাপলার কাছে আজকেও পান খাওয়া বাবদ ৫টাকার আব্দার!
– আরে দে না! পান ই তো! এই বয়সে আর কি খাওয়াবি?
এসব কুৎসিত কথা শাপলার খারাপ লাগে না! শাপলা পাঁচ টাকা দেয়।
কিন্তু সময় বদলে গেছে। পানের দাম পাঁচ টাকা। শাপলার দামও বেড়েছে, তবে তিনশ টাকার বেশী নয়। নায়িকাদের সখি বান্ধবি হিসেবে শ দুয়েক ছবিতে নেচেছে শাপলা। এখন সে দিন নেই। বয়স ত্রিশ ছাড়িয়েছে বোধহয় আরো বছর তিন চার আগে। ত্রিশের পরে আর হিসেব করেনি। হিসেব করতে ভয় করে।
মধুবাগে বাসা ভাড়া তিনহাজার, বাসা নয়। একটা রুম। ময়মনসিংহে বুড়ো মা আছে, সেখানে আরো তিন। খাওয়া দাওয়া সহ আরো পাঁচ- এখনো বিয়ে করেনি তবুও বিশ হাজারের কম হলে এ বাজারে কিভাবে সম্ভব? কিন্তু কাজ কই?
এখন ইন্ডিয়ার চিকন কোমর চলছে। ঝাকে ঝাকে আসছে। শাপলাদের বাজার নেই! সারাদিন এ সেটে ও সেটে ঘুরে ঘুরে কাজের ধর্না দিতে ভালো লাগে না। এক শিফটে তিনশ দিতেও প্রোডাকশন রাত অব্দি বসিয়ে রাখে অথবা আরো অনেক কিছু! কিন্তু আর কত?
আজ শাপলার রীতিমত ভয় করছে। কিসের যেন ভয়!
শাপলাদের জন্য আলাদা গ্রিনরুম থাকে না। একটা কমন রুম-তাও কখনো কখনো জোটে না। কিন্তু মেকআপ ম্যান বাদশা মিয়া যা বললো তা কি সত্যি?
যদি সত্যিই হয় তাহলে শাপলার আলো ঝলমলে দিনে অবশেষে সন্ধ্যার ঘনঘোর!
বাঁধা কাজটা ছেড়ে দিল শাপলা। শুটিং শুরু হতে এখনো দেরি আছে। ফ্লোর থেকে বেরিয়ে এলো। এ কেমন ধুসর বিকেল? গাছের একটা পাতাও নড়ছে না, মাথার ভেতর যেন হুট করেই সমস্ত কিছু খেয়ে ফেলছে একটা শব্দের ঘুণপোকা। প্রবীণ বাদশা মিয়া পোকাটা ঢুকিয়েছে।
গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় চাচা কিছু জিগ্যেস করার আগেই সে চলে যায়। সকালের মাছের আঁশটে গন্ধ অন্যদিন সহ্য হয়, আজ আর হচ্ছে না। কাওরান বাজারের জঞ্জাল ছেড়ে কখন সে হাতিরঝিলের মুক্ত বাতাসে দাঁড়াবে? খুব ব্যস্ত হয়ে ওঠে শাপলা।
“এত জোরে বাইন্ধা উপরে উঠাইছো কিন্তু আর কদ্দিন শাপলা? শইলের অবস্থাটা মাইনা নাও-বুঝলা? আর তো হয় না!” – বাদশার অমন সরল কথাটা যেন এতদিন শোনার জন্যই বসে ছিল শাপলা।
তরুন ট্রাফিকটি হাত উঠালে সিগন্যাল পড়ে।
লাল ওড়নার কোনা দিয়ে চোখের কোনাটা মুছতে মুছতে গ্রিন সিগন্যাল পেরিয়ে যায় শাপলা।
ততক্ষনে সন্ধ্যা। হাতিরঝিলে পানিটুকু রঙ্গীন করে শহরের বাতিগুলো হেসে ওঠে, নিদারুন বিদ্রুপে।
– ঘুণপোকা
৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭